কলকাতা, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: হৃদ্রোগের উপসর্গ অনেক সময় উপেক্ষিত হওয়ায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় দেরি হয়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে হৃদ্রোগ। এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারতের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা মণিপাল হসপিটালস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া বিশ্ব হৃদ্দিবস, ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রাক্কালে আয়োজন করল ‘হার্ট অব ইনোভেশন কার্ডিয়াক সামিট’। অনুষ্ঠানে হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন ধরনের হৃদ্রোগের চিকিৎসা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সুস্থ হয়ে বর্তমানে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন এমন একাধিক হৃদ্রোগী অংশগ্রহণ করেন। রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি, এই সম্মেলনে হৃদ্রোগের পরিবর্তিত চিত্র নিয়ে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ এবং রোগীদের মধ্যে মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ তৈরি হয়।
২০২৬ সালের বিশ্ব হৃদ্দিবসের মূল বার্তা “ডোন্ট মিস আ বিট”-এর মাধ্যমে হৃদ্রোগের সতর্কতামূলক লক্ষণগুলি চিহ্নিত করা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার বিশিষ্ট হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ প্রকাশ কুমার হাজরা, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান – কার্ডিওলজি, ডাঃ সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ সুপ্রতীপ কুণ্ডু, ডাঃ সৌম্য কান্তি দত্ত, ডাঃ প্রদীপ ভৌমিক, কনসালট্যান্ট – ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি এবং ডাঃ কৌশিক মুখার্জি, কনসালট্যান্ট – কার্ডিওথোরাসিক অ্যান্ড ভাসকুলার সার্জারি-কে নিয়ে একটি বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার মূল বিষয় ছিল হৃদ্রোগের ক্রমশ অবনতি হয়ে কীভাবে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া দুর্বলতা বা হার্ট ফেলিওরের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। হৃদ্স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির এই উদ্যোগে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা রাজেশ শর্মা এবং কলকাতার বিশিষ্ট মডেল ও অভিনেতা দীপাঞ্জন বসাক।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় অংশগ্রহণকারীদের জন্য সিপিআর প্রশিক্ষণ দিয়ে। প্রশিক্ষণটি পরিচালনা করেন ডাঃ অশোক মিশ্র, কনসালট্যান্ট – জরুরি চিকিৎসা বিভাগ। এরপর ঢাকুরিয়া হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে “হার্ট অ্যাটাক ধীরে ধীরে হার্ট ফেলিওরে পরিণত হওয়া কি এক মহামারির রূপ নিচ্ছে?” বিষয়ের উপর একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি, হৃদ্রোগ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার লক্ষ্যে একটি প্রশ্নোত্তর পর্বও আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য হৃদ্স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যেখানে উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেন উপস্থিত সকলে এবং সঠিক উত্তরদাতাদের পুরস্কৃত করা হয়।

মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া হৃদ্রোগের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখানে ২৪ ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা, অত্যাধুনিক ক্যাথ ল্যাবরেটরি, লেজার অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, ট্যাভি, টাভর, টেভার, লিডলেস পেসমেকার, ইন্ট্রাভাসকুলার শকওয়েভ ওরবিটাল রোটেশনাল অ্যাব্লেশন, পালসড ফিল্ড অ্যাব্লেশন, মিনিমালি ইনভেসিভ কার্ডিয়াক সার্জারি, করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি এবং জন্মগত হৃদ্যন্ত্রের ত্রুটি সংশোধনের মতো উন্নত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার পরিষেবা উপলব্ধ রয়েছে।
আলোচনায় ডাঃ প্রকাশ কুমার হাজরা বলেন, “ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি জটিল হৃদ্রোগের চিকিৎসার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এর মাধ্যমে আরও নির্ভুলভাবে বহু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত ওপেন-হার্ট সার্জারির প্রয়োজন এড়ানো যায়। উন্নত অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট বসানোর পদ্ধতি থেকে শুরু করে নতুন ধরনের ক্যাথেটার-নির্ভর চিকিৎসা—এই ক্ষেত্রটি ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে। তবে যেকোনও চিকিৎসা পদ্ধতির সাফল্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ রোগের উপসর্গ দ্রুত চিহ্নিত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন সময়ে চিকিৎসা শুরু করা, যাতে হৃদ্যন্ত্রে স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যায় এবং হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।”
ডাঃ কৌশিক মুখার্জি বলেন, “হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি ও চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে। কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জারির ক্ষেত্রে ন্যূনতম আক্রমণাত্মক অস্ত্রোপচার এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার রোগীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং অস্ত্রোপচারের শারীরিক প্রভাবও কমিয়ে আনতে সাহায্য করছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু রোগের কার্যকর চিকিৎসা করা নয়, রোগী যাতে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করা। হৃদ্রোগের চিকিৎসা ক্রমশ উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়মতো চিকিৎসা, উন্নত অস্ত্রোপচার পদ্ধতি এবং অস্ত্রোপচারের পর সামগ্রিক পরিচর্যার সমন্বয়ে একটি বহুমুখী চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার হাসপাতাল ডিরেক্টর শ্রী দিলীপ কুমার রায় বলেন, “হার্ট অব ইনোভেশন কার্ডিয়াক সামিট’-এর মাধ্যমে আমরা হৃদ্স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রোগীকে রাখতে চেয়েছি। হৃদ্যন্ত্রের বিভিন্ন চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বর্তমানে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন এমন রোগীদের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উন্নত হৃদ্রোগ চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হল মানুষকে তাদের প্রিয় ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা তৈরি করতে চাই, যাতে তাঁরা সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেন এবং নিজেদের হৃদ্স্বাস্থ্যের প্রতি আরও সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।”







